• বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নির্বাচন এবং শাসকশ্রেণির নতুন সংকট

নির্বাচন এবং শাসকশ্রেণির নতুন সংকট

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী হাসিনা-আওয়ামী সরকারের পতনের পর ছাত্রনেতাদের একাংশের সহযোগিতায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু এ অভ্যুত্থানটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ববিহীন, কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচিবিহীন এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ-বিহীন। এ সময়ে শাক্তিশালী বিপ্লবী শক্তির অনুপস্থিতির সুযোগটি নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ এবং দালাল শাসকশ্রেণি। ছাত্র নেতৃত্বদের গুরুতর রাজনৈতিক দুর্বলতা, বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদের কারণে অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে দেশ-বিরোধী ও গণ-বিরোধী বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি রাষ্টক্ষমতা নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সামরিক-বেসামরিক  আমলা, এনজিও কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ, বড় বুর্জোয়া এবং ছাত্র নেতৃত্বদের একাংশকে নিয়ে “তৃতীয় শক্তি” সরকার গঠন করে। এই সরকারকে সমর্থন করে হাসিনাবিরোধী সকল বুর্জোয়া, ধর্মবাদী এবং বাম নামধারী সংস্কারবাদী পার্টিগুলো। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের যে জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃত্বদের একাংশ জুলাই চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে হাসিনার বুর্জোয়া সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালাল ইউনূস সরকারে অংশ নিয়ে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির নব্য দালাল বনে যায়।

ইউনূস সরকার সংস্কার এবং ফ্যাসিস্টদের বিচারের ধুয়া তুলে জাতীয় নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল এবং নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। যাকে মদদ দেয় জামাতসহ ধর্মবাদী দলগুলো এবং তৃতীয় শক্তির মদদপ্রাপ্ত কিংস পার্টি এনসিপি। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বৃহৎ পার্টি বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিলাষে নির্বাচনের দাবি জোরদার করে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের বিভিন্ন অংশের সমর্থনও পায়। কোন্দল, আপস-সমঝোতা, এবং জুলাই ঘোষণা, ঐকমত্য কমিশন, সনদ তৈরি এবং তথাকথিত সংস্কার ও বিচারের বহু নাটকের পর অবশেষে ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়। বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির বৃহৎ দল বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে নতুন বন্দোবস্তের দাবিদার এনসিপি ’৭১-এর গণহত্যার সহযোগী রাজাকার জামাতের সাথে জোট বেধে নির্বাচনে হেরে বিরোধী দলের অসনে বসেছে।

ড.ইউনূসের ‘সভ্য সমাজের’ বুর্জোয়া গণতন্ত্রের তথাকথিত ‘সৌন্দর্য’, ‘সুষ্ঠু’ ও ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচনকে পাহারা দিতে অন্তর্বর্তী সরকার ৯ লক্ষাধিক সশস্ত্র ফোর্স (সেনাবাহিনী, নৌ-বহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার) নিয়োজিত করেছিল। তথাপি বেশ কিছু সহিংসতা হয়েছে নির্বাচনের আগে, সময়ে ও পরে। নিহত, আহত, মারামারি, বাড়িঘর পুড়ানো, লুটপাট– এসবই হয়েছে। যা বেশ কিছুদিন চলমান ছিল। এখন যা আবার নব-উদ্যমে চলমান রয়েছে। ড. ইউনূসের মতে ইতিহাসের সেরা ও ঐতিহাসিক নির্বাচন তারা করেছে। কিন্তু তৃতীয় শক্তি ও ড.ইউনূসের মিত্র জামাত-এনসিপি জোট অন্তত ৩০ আসনে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। ইলেকশন ইনজিনিয়ারিং-এর অভিযোগ সকল পক্ষ থেকেই তোলা হয়েছে। এমনকি, পরাজয়ের আলামত পেয়ে জামাত নেতা শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামকে ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে পাশ করানোর অভিযোগও উঠেছে।

বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ লক্ষ টাকা জব্দ হয়েছে বিএনপি-জামাত-এনসিপি’র পক্ষে ভোট কেনার অভিযোগে। এ দুর্নীতিতে অবশ্য “সৎ-লোকের শাসনে”র দাবিদার জামাত এগিয়েছিল। ভোটের আগে আইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর নিয়ে সাধারণ জনগণ, বিশেষত গ্রামীণ নারীদের ভোটকেনার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ছিল। এ নিয়ে বিএনপি-জামাত কর্মীদের মাঝে  দ্বন্দ্ব-সংঘাতও হয়েছে।

আরপিও-তে (নির্বাচন কমিশনের করা নির্বাচনি বিধি-নিষেধ) নিষেধ থাকলেও প্রায় ১৪ জন বিএনপি-পন্থি ঋণখেলাফি প্রার্থিকে ভোট করতে দেয়া হয়েছে। ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও জামাতের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ দাখিল হয়েছে জান্নাতে যাওয়ার টিকিট বিক্রিরও। নির্বাচনের পর ফলাফল প্রশ্নে বুর্জোয়া বড় দল বিএনপি-জামাত-এনসিপি কিছু দিন কারচুপির অভিযোগ তুলে দ্বন্দ্ব-কলহে মেতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই বিবাদ কমিয়ে আনে। কিন্তু বিএনপি সাংসদরা সাংসদ হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। জামাত-এনসিপি প্রথমে শপথ নেয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করলেও সুবিধা করতে না পেরে সাংসদ এবং সংস্কার পরিষদ সদস্য– উভয়টারই শপথ নিয়েছে। কোনো কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেছেন এভাবে দুটো শপথ সংবিধান-বিরোধী। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মার্কিন নাগরিক আলী রিয়াজের কথাই তো সংবিধান!

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে শাসকশ্রেণি বুর্জোয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার বাগাড়ম্বর করলেও এগুলো জনগণের গণতন্ত্র নয়। তাদের শোষণ-শাসনের যঁাতাকল থেকে মুক্তিতো আরো সুদূর পরাহত। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মতো বিএনপি যে সব জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচি নিয়েছে (খাল কাটা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড– ইত্যাদি) তাতে জনগণের ভাগ্যের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। যুগে যুগে নানা সংস্কার হয়েছে। তাতে সাময়িক কিছু উপকার হচ্ছে মনে হলেও জনগণের জীবনযাত্রার মান একই থেকে যাচ্ছে বা আরো খারাপ হচ্ছে। শ্রমিকের শ্রম-শোষণ অব্যাহত থাকছে, সুস্থ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মতো মজুরি তারা পাচ্ছেন না, কৃষক কৃষি উপকরণ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, বরং তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদী, দালাল পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহতই থাকছে। অটোরিক্সা-হকার উচ্ছেদ চলছেই। নিত্যপণ্য শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে। পাহাড়-সমতলে আদিবাসী ও সারাদেশে নারী নিপীড়ন চলছেই। ঘুস-দুর্নীতি-চাঁদাবাজী-নারী পাচার অব্যাহত থাকছে। আরো যা ভয়ংকর তা হলো– ’৭১-এর রাজাকার জামাতসহ ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ রাষষ্ট্রক্ষমতায় জেঁকে বসেছে। মার্কিন, চীন, রাশিয়া, ইইউসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে বিএনপি সরকার সহ বুর্জোয়া দলগুলোর গলাগলি অব্যাহত। বরং তাদের সাথে দাসখতমূলক সকল চুক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের করা দাসত্বমূলক বন্দর ও বাণিজ্যচুক্তি অব্যাহত থাকছে। বিএনপি সরকার নতুন করে ইইউ-এর সাথে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। যা সার্বভৌমত্বের জলাঞ্জলি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তাই ব্যবস্থা একই থাকছে, মুখ বদল হয়েছে মাত্র।

জুলাই সনদ ও গণভোট

অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের নামে ঐকমত্য কমিশনের জুলাই সনদ তৈরি ও গণভোটের আয়োজন ছিল শাসকশ্রেণির তৃতীয় শক্তির শয়তানি প্রতারণা ও গোঁজামিলে ভরপুর। যা মূলত তৃতীয় শক্তির দালালি করা জামাত-এনসিপি’র রাজনীতির শক্ত ভিত তৈরির ষড়যন্ত্র মাত্র। বিএনপি তাদের গোষ্ঠীগত/দলীয় স্বার্থে তাতে অনেক ভিন্নমত দিলেও সনদে তা যুক্ত করেনি তৃতীয় শক্তির ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি তখন কৌশলগতভাবেই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল বলেও তারা সংসদে স্বীকার করেছে। এ কারণেই জামাত-এনসিপি নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের দাবি তুলে হৈচৈ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় দরাদরি করে আপস-রফার ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের দিনে একইসাথে গণভোটের আয়োজন করেছিল। গণভোটের ফলাফলেও বড় ধরনের জালিয়াতি করেছে নির্বাচন কমিশন। দু’দুবার পরিবর্তনের পর শেষে বলা হয়েছে গণভোটে ভোট পড়েছে প্রায় ৭০%। অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৬০%। এই ১০%-এর বেশি ভোট গণভোটে পড়াটা একটা স্থূল জালিয়াতি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এখন বিএনপি বলছে গণভোট সংবিধানে নেই। সত্য। কিন্তু ইউনূসের সরকারটাও তো সংবিধানে নেই! অন্যদিকে জামাত-এনসিপি সংবিধান মেনে শপথ নিয়ে বলছে সর্বক্ষেত্রে সংবিধান মানার দরকার নেই। অর্থাৎ, যেটা আমার স্বার্থে সেটা মানবো, নতুবা মানবো না। এ-তো এক মগের মুল্লুক! শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশ যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের প্রতারণা চাপা দিতে চাচ্ছে, আবার তা সংকটকে বাড়িয়েও তুলছে। জামাত-এনসিপি মাঠ গরম করছে এই বলে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না; বিএনপি বলছে তারা অক্ষরে অক্ষরে সনদ বাস্তবায়ন করবে। দুটোই তো প্রতারণা। যে যার মতো করে সংস্কার করে নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে চায়। কোন্দলের আসল বিষয়টা হলো, ক্ষমতার বড়ো ভাগটা হাতে রাখা ও হাতে আনার লড়াই। হাসিনা আমলেও সেটা ছিল, এখনো তাই। বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এভাবে শুধু নিজেদের সংকট অব্যাহত রেখেছে তা নয়, তারা তাদের সাংবিধানিক সংকট সমাধানেও অক্ষম প্রমাণিত হচ্ছে। তৃতীয় শক্তির প্রতিনিধিরা নিজেদের নব্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে, আর মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে ঐক্য ও সমঝোতার মধুর বাণী বিতরণ করছে। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনই বুর্জোয়া বিরোধীদল জামাত-এনসিপি হট্টগোল ও ওয়াকআউট করেছে। তারা রাজপথে নামবে বলে হুমকিও দিয়ে চলেছে।

এর সাথে যুক্ত হচ্ছে শাসকশ্রেণির মুক্তিযুদ্ধ চেতনা ব্যবহার নিয়ে কোন্দল। আগামী দিনগুলোতে আমরা পুরানো বন্দোবস্তের রোগগুলোকেই দেখতে পাবো আবার। আর সেই সাথে যুক্ত হবে আওয়ামী রাজনীতি বন্ধ না খোলা থাকবে– তা নিয়ে এদের সংকট।

জনগণের করণীয়

জনগণকে এসবের মুখোশ উন্মোচনের পাশাপাশি নিজেদের পথ নিজেদের দেখতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অর্থাৎ সংবিধান সংস্কার-সংশোধন বা মুক্তিযুদ্ধ বা জ্বালানি সংকট– এসব নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তা হলো বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির মধ্যকার গোষ্ঠীগত স্বার্থের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিবাদ-কলহ। অর্থাৎ ক্ষমতার কামড়াকামড়ি। এতে নিপীড়িত জনগণের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই।

শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী-নারীসহ সকল স্তরের নিপীড়িত জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদের বিপ্লবী রাজনীতিতে সজ্জিত ও সংগঠিত হতে হবে। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি জন-গণতান্ত্রিক সরকার-সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে।

নির্বাচন এবং শাসকশ্রেণির নতুন সংকট

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী হাসিনা-আওয়ামী সরকারের পতনের পর ছাত্রনেতাদের একাংশের সহযোগিতায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু এ অভ্যুত্থানটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ববিহীন, কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচিবিহীন এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ-বিহীন। এ সময়ে শাক্তিশালী বিপ্লবী শক্তির অনুপস্থিতির সুযোগটি নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ এবং দালাল শাসকশ্রেণি। ছাত্র নেতৃত্বদের গুরুতর রাজনৈতিক দুর্বলতা, বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদের কারণে অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে দেশ-বিরোধী ও গণ-বিরোধী বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি রাষ্টক্ষমতা নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সামরিক-বেসামরিক  আমলা, এনজিও কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ, বড় বুর্জোয়া এবং ছাত্র নেতৃত্বদের একাংশকে নিয়ে “তৃতীয় শক্তি” সরকার গঠন করে। এই সরকারকে সমর্থন করে হাসিনাবিরোধী সকল বুর্জোয়া, ধর্মবাদী এবং বাম নামধারী সংস্কারবাদী পার্টিগুলো। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের যে জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃত্বদের একাংশ জুলাই চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে হাসিনার বুর্জোয়া সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালাল ইউনূস সরকারে অংশ নিয়ে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির নব্য দালাল বনে যায়।

ইউনূস সরকার সংস্কার এবং ফ্যাসিস্টদের বিচারের ধুয়া তুলে জাতীয় নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল এবং নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। যাকে মদদ দেয় জামাতসহ ধর্মবাদী দলগুলো এবং তৃতীয় শক্তির মদদপ্রাপ্ত কিংস পার্টি এনসিপি। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বৃহৎ পার্টি বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিলাষে নির্বাচনের দাবি জোরদার করে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের বিভিন্ন অংশের সমর্থনও পায়। কোন্দল, আপস-সমঝোতা, এবং জুলাই ঘোষণা, ঐকমত্য কমিশন, সনদ তৈরি এবং তথাকথিত সংস্কার ও বিচারের বহু নাটকের পর অবশেষে ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়। বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির বৃহৎ দল বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে নতুন বন্দোবস্তের দাবিদার এনসিপি ’৭১-এর গণহত্যার সহযোগী রাজাকার জামাতের সাথে জোট বেধে নির্বাচনে হেরে বিরোধী দলের অসনে বসেছে।

ড.ইউনূসের ‘সভ্য সমাজের’ বুর্জোয়া গণতন্ত্রের তথাকথিত ‘সৌন্দর্য’, ‘সুষ্ঠু’ ও ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচনকে পাহারা দিতে অন্তর্বর্তী সরকার ৯ লক্ষাধিক সশস্ত্র ফোর্স (সেনাবাহিনী, নৌ-বহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার) নিয়োজিত করেছিল। তথাপি বেশ কিছু সহিংসতা হয়েছে নির্বাচনের আগে, সময়ে ও পরে। নিহত, আহত, মারামারি, বাড়িঘর পুড়ানো, লুটপাট– এসবই হয়েছে। যা বেশ কিছুদিন চলমান ছিল। এখন যা আবার নব-উদ্যমে চলমান রয়েছে। ড. ইউনূসের মতে ইতিহাসের সেরা ও ঐতিহাসিক নির্বাচন তারা করেছে। কিন্তু তৃতীয় শক্তি ও ড.ইউনূসের মিত্র জামাত-এনসিপি জোট অন্তত ৩০ আসনে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। ইলেকশন ইনজিনিয়ারিং-এর অভিযোগ সকল পক্ষ থেকেই তোলা হয়েছে। এমনকি, পরাজয়ের আলামত পেয়ে জামাত নেতা শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামকে ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে পাশ করানোর অভিযোগও উঠেছে।

বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ লক্ষ টাকা জব্দ হয়েছে বিএনপি-জামাত-এনসিপি’র পক্ষে ভোট কেনার অভিযোগে। এ দুর্নীতিতে অবশ্য “সৎ-লোকের শাসনে”র দাবিদার জামাত এগিয়েছিল। ভোটের আগে আইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর নিয়ে সাধারণ জনগণ, বিশেষত গ্রামীণ নারীদের ভোটকেনার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ছিল। এ নিয়ে বিএনপি-জামাত কর্মীদের মাঝে  দ্বন্দ্ব-সংঘাতও হয়েছে।

আরপিও-তে (নির্বাচন কমিশনের করা নির্বাচনি বিধি-নিষেধ) নিষেধ থাকলেও প্রায় ১৪ জন বিএনপি-পন্থি ঋণখেলাফি প্রার্থিকে ভোট করতে দেয়া হয়েছে। ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও জামাতের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ দাখিল হয়েছে জান্নাতে যাওয়ার টিকিট বিক্রিরও। নির্বাচনের পর ফলাফল প্রশ্নে বুর্জোয়া বড় দল বিএনপি-জামাত-এনসিপি কিছু দিন কারচুপির অভিযোগ তুলে দ্বন্দ্ব-কলহে মেতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই বিবাদ কমিয়ে আনে। কিন্তু বিএনপি সাংসদরা সাংসদ হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। জামাত-এনসিপি প্রথমে শপথ নেয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করলেও সুবিধা করতে না পেরে সাংসদ এবং সংস্কার পরিষদ সদস্য– উভয়টারই শপথ নিয়েছে। কোনো কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেছেন এভাবে দুটো শপথ সংবিধান-বিরোধী। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মার্কিন নাগরিক আলী রিয়াজের কথাই তো সংবিধান!

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে শাসকশ্রেণি বুর্জোয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার বাগাড়ম্বর করলেও এগুলো জনগণের গণতন্ত্র নয়। তাদের শোষণ-শাসনের যঁাতাকল থেকে মুক্তিতো আরো সুদূর পরাহত। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মতো বিএনপি যে সব জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচি নিয়েছে (খাল কাটা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড– ইত্যাদি) তাতে জনগণের ভাগ্যের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। যুগে যুগে নানা সংস্কার হয়েছে। তাতে সাময়িক কিছু উপকার হচ্ছে মনে হলেও জনগণের জীবনযাত্রার মান একই থেকে যাচ্ছে বা আরো খারাপ হচ্ছে। শ্রমিকের শ্রম-শোষণ অব্যাহত থাকছে, সুস্থ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মতো মজুরি তারা পাচ্ছেন না, কৃষক কৃষি উপকরণ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, বরং তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদী, দালাল পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহতই থাকছে। অটোরিক্সা-হকার উচ্ছেদ চলছেই। নিত্যপণ্য শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে। পাহাড়-সমতলে আদিবাসী ও সারাদেশে নারী নিপীড়ন চলছেই। ঘুস-দুর্নীতি-চাঁদাবাজী-নারী পাচার অব্যাহত থাকছে। আরো যা ভয়ংকর তা হলো– ’৭১-এর রাজাকার জামাতসহ ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ রাষষ্ট্রক্ষমতায় জেঁকে বসেছে। মার্কিন, চীন, রাশিয়া, ইইউসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে বিএনপি সরকার সহ বুর্জোয়া দলগুলোর গলাগলি অব্যাহত। বরং তাদের সাথে দাসখতমূলক সকল চুক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের করা দাসত্বমূলক বন্দর ও বাণিজ্যচুক্তি অব্যাহত থাকছে। বিএনপি সরকার নতুন করে ইইউ-এর সাথে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। যা সার্বভৌমত্বের জলাঞ্জলি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তাই ব্যবস্থা একই থাকছে, মুখ বদল হয়েছে মাত্র।

জুলাই সনদ ও গণভোট

অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের নামে ঐকমত্য কমিশনের জুলাই সনদ তৈরি ও গণভোটের আয়োজন ছিল শাসকশ্রেণির তৃতীয় শক্তির শয়তানি প্রতারণা ও গোঁজামিলে ভরপুর। যা মূলত তৃতীয় শক্তির দালালি করা জামাত-এনসিপি’র রাজনীতির শক্ত ভিত তৈরির ষড়যন্ত্র মাত্র। বিএনপি তাদের গোষ্ঠীগত/দলীয় স্বার্থে তাতে অনেক ভিন্নমত দিলেও সনদে তা যুক্ত করেনি তৃতীয় শক্তির ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি তখন কৌশলগতভাবেই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল বলেও তারা সংসদে স্বীকার করেছে। এ কারণেই জামাত-এনসিপি নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের দাবি তুলে হৈচৈ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় দরাদরি করে আপস-রফার ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের দিনে একইসাথে গণভোটের আয়োজন করেছিল। গণভোটের ফলাফলেও বড় ধরনের জালিয়াতি করেছে নির্বাচন কমিশন। দু’দুবার পরিবর্তনের পর শেষে বলা হয়েছে গণভোটে ভোট পড়েছে প্রায় ৭০%। অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৬০%। এই ১০%-এর বেশি ভোট গণভোটে পড়াটা একটা স্থূল জালিয়াতি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এখন বিএনপি বলছে গণভোট সংবিধানে নেই। সত্য। কিন্তু ইউনূসের সরকারটাও তো সংবিধানে নেই! অন্যদিকে জামাত-এনসিপি সংবিধান মেনে শপথ নিয়ে বলছে সর্বক্ষেত্রে সংবিধান মানার দরকার নেই। অর্থাৎ, যেটা আমার স্বার্থে সেটা মানবো, নতুবা মানবো না। এ-তো এক মগের মুল্লুক! শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশ যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের প্রতারণা চাপা দিতে চাচ্ছে, আবার তা সংকটকে বাড়িয়েও তুলছে। জামাত-এনসিপি মাঠ গরম করছে এই বলে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না; বিএনপি বলছে তারা অক্ষরে অক্ষরে সনদ বাস্তবায়ন করবে। দুটোই তো প্রতারণা। যে যার মতো করে সংস্কার করে নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে চায়। কোন্দলের আসল বিষয়টা হলো, ক্ষমতার বড়ো ভাগটা হাতে রাখা ও হাতে আনার লড়াই। হাসিনা আমলেও সেটা ছিল, এখনো তাই। বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এভাবে শুধু নিজেদের সংকট অব্যাহত রেখেছে তা নয়, তারা তাদের সাংবিধানিক সংকট সমাধানেও অক্ষম প্রমাণিত হচ্ছে। তৃতীয় শক্তির প্রতিনিধিরা নিজেদের নব্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে, আর মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে ঐক্য ও সমঝোতার মধুর বাণী বিতরণ করছে। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনই বুর্জোয়া বিরোধীদল জামাত-এনসিপি হট্টগোল ও ওয়াকআউট করেছে। তারা রাজপথে নামবে বলে হুমকিও দিয়ে চলেছে।

এর সাথে যুক্ত হচ্ছে শাসকশ্রেণির মুক্তিযুদ্ধ চেতনা ব্যবহার নিয়ে কোন্দল। আগামী দিনগুলোতে আমরা পুরানো বন্দোবস্তের রোগগুলোকেই দেখতে পাবো আবার। আর সেই সাথে যুক্ত হবে আওয়ামী রাজনীতি বন্ধ না খোলা থাকবে– তা নিয়ে এদের সংকট।

জনগণের করণীয়

জনগণকে এসবের মুখোশ উন্মোচনের পাশাপাশি নিজেদের পথ নিজেদের দেখতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অর্থাৎ সংবিধান সংস্কার-সংশোধন বা মুক্তিযুদ্ধ বা জ্বালানি সংকট– এসব নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তা হলো বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির মধ্যকার গোষ্ঠীগত স্বার্থের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিবাদ-কলহ। অর্থাৎ ক্ষমতার কামড়াকামড়ি। এতে নিপীড়িত জনগণের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই।

শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী-নারীসহ সকল স্তরের নিপীড়িত জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদের বিপ্লবী রাজনীতিতে সজ্জিত ও সংগঠিত হতে হবে। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি জন-গণতান্ত্রিক সরকার-সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র